Add

Tuesday, October 6, 2015

সরকারি হাসপাতালের ওষুধ যোগসাজশে যায় ফার্মেসিতে



মোরশেদ তালুকদার ॥

 বিনামূল্যে বিতরণের জন্য চট্টগ্রামের ১৪টি উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতি মাসে ৩০ পদের প্রায় ২০ কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ করে সরকার। কিন্তু অভিযোগ আছে, এসব ওষুধের বেশিরভাগই সংশ্লিষ্ট রোগীরা পান না। বরং হাসপাতালগুলোর এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি নার্সও বিনামূল্যের এসব ওষুধ সরবরাহ করছে ব্যক্তি মালিকানাধীন ফার্মেসিগুলোতে। অধিক মুনাফার আশায় ফার্মেসি মালিকরাও কম দামে এসব ওষুধ সংগ্রহ করছেন। যা আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রসঙ্গত, জেলা প্রশাসনের অভিযানে সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ ফার্মেসিতে সরবরাহ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এদিকে সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ ফার্মেসিতে বিক্রির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে চট্টগ্রামের ১৪টি উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নিকট জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে দাপ্তরিক নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিুজর রহমান সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেয়া হয়। ওই নির্দেশনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরতদের আত্মীয়-স্বজনের ফার্মেসি রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। এছাড়া আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় জেলার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত মিটিংয়েও এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হবে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে শুধু চট্টগ্রাম মহানগরীতে জেলা প্রশাসনের পৃথক তিনটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি রাজশাহী, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের একাধিক ফার্মেসি থেকেও সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ জব্দ করা হয়। যা সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ ফার্মেসিতে বিক্রি হওয়াকেই প্রমাণ করে। তবে সাধারণ লোকজনের অভিযোগ, বিচ্ছিন্ন পৃথক কয়েকটি অভিযানে যে পরিমাণ ওষুধ ধরা পড়ে তা নগণ্য।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ১৪টি উপজেলায় একটি করে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছাড়াও ৭৩টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে ১৩৩টি।
পাশাপাশি সিভিল সার্জনের অধীন ৯টি আরবান ডিসপেনসারিও রয়েছে। এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতি মাসে ৩০ পদের প্রায় ২০ কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ করা হয় রোগীদের বিনামূল্যে বিতরণের জন্য। তবে সাধারণ রোগীদের অভিযোগ
, তাদের প্রায় সময় বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করতে চান না সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর তত্ত্বাবধায়করা। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর রোগীরা এ ধরনের অভিযোগ প্রায় করে থাকেন।
এদিকে রোগীরা যখন বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়া নিয়ে অভিযোগ করেন, তখন জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন অভিযানে ব্যক্তি মালিকানাধীন ফার্মেসিগুলো থেকে জব্দ করা হচ্ছে সরকারি হাসপাতালের বিনামূল্যের ওষুধ। সর্বশেষ গতকাল নগরীর শুলকবহর মির্জারপুল আবাসিক এলাকার ২০ নং বাড়ির ৪র্থ তলার একটি বাসায় বাসায় তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি ওষুধ জব্দ করে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই বাসায় থাকতেন ফৌজদারহাট বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রুনা বড়ণ্ডয়া। একই অভিযানে রুনা বড়ণ্ডয়ার স্বামী অনিক বড়ণ্ডয়ার মালিকানাধীন মির্জারপুল এলাকার জনকল্যাণ ফার্মেসি থেকেও সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ পাওয়া যায়। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর নগরীর চাক্তাই এলাকার একটি ওষুধের দোকান থেকে এবং ২৫ আগস্ট আলকরণ এলাকার একটি হাসপাতাল থেকে বিপুল পরিমাণ সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ জব্দ করা হয়েছিল। এদিকে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানের ফার্মেসি থেকেও থেকে র‌্যাব ও ওষুধ প্রশাসনের অভিযানে সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ জব্দ করা হয়েছে।
গত আগস্ট মাসে সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ জব্দের ঘটনায় জেলা সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্তে ওষুধ সরবরাহে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নগরীতে বিভিন্ন ফার্মেসিতে যে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আরডিসি মোহাম্মদ রুহুল আমিন। তিনি আজাদীকে বলেন, গত আগস্ট থেকে বিভিন্ন ফার্মেসিতে যেসব অভিযান পরিচালনা করি এর তিনটিতেই সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ জব্দ করি। আমরা বিষয়গুলো সিভিল সার্জনকে জানিয়েছি।
এদিকে গতকাল নগরীতে নার্সের বাসা ও তার স্বামীর মালিকানাধীন ফার্মেসি থেকে সরকারি ওষুধ জব্দের পর সিভিল সার্জন গতকাল ১৪টি উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক আদেশে তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করার নির্দেশনা দেন। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরতদের নিকটাত্মীয়দের কোনো ফার্মেসি রয়েছে কিনা তা চিহ্নিত করে ওইসব ফার্মেসিতে অভিযান চালাতে হবে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী গতকাল আজাদীকে বলেন, লাল সবুজের ব্লিস্টারে বা এ্যালু ফয়েলের সরকারি ওষুধ যাতে আর কোনো ফার্মেসিতে পাওয়া না যায় সেই ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার আমি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নিকট চিঠি লিখেছি। তাদেরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে হাসপাতালে কর্মরতদের আত্মীয়স্বজনের যদি ফার্মেসি থাকে তার তালিকা করে ওখানে অভিযান চালাতে। যেহেতু একজন নার্সের স্বামীর ফার্মেসি থেকে সরকারি বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়া গেছে, তাই এ ধরনের ঘটনায় অন্যদের জড়িত থাকার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
চট্টগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জন ও চট্টগ্রাম জেনারেল হা্‌সপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী বলেন, সরকারি বিনামূল্যের ওষুধ বাইরে পাওয়া যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা অন্যায় ও গর্হিত কাজ। যারাই এর সাথে জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

No comments:

Post a Comment